ডেঙ্গু ভাইরাস

ডেঙ্গু একটি মশা বাহিত ভাইরাস জনিত সংক্রমণ যা দ্রুত ছড়িয়ে এই ভাইরাসের পাঁচটি সেরোটাইপ পাওয়া যায়। এই ভাইরাসের বাহক এডিস ইজিপ্টি মশা যা বাংলাদেশে এডিস মশা নামে পরিচিত। এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস, জিকা ভাইরাসেরও বাহক হিসেবে পরিচিত। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা নানা ভারসাম্মের সাথে এর ডেঙ্গু ঝুঁকি নিহিত। এখন ডেঙ্গু এশিয়ার এবং ল্যাটিন আমেরিকার কিছু দেশে গুরুতর অসুস্থতার একটি প্রধান কারণ বিশেষ করে শিশুদের। অনেক সময় শিশুদের ক্ষত্রে মৃত্যুর কারণও হয়।

সম্প্রতি কয়েক দশকে বিশ্ব ব্যাপী মারাত্মক আঁকার ধারন করেছে। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ডেঙ্গু ঝুঁকিতে বসবাস করছে। সম্প্রতি একটি গবেষণা তে দেখা যায় বিশ্বের প্রায় ৩৯ কোটি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। যার একতৃতীয়াংশ গুরুতর অসুস্থ হয়। অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় বিশ্বের ১২৮ দেশের প্রায় ৩ কোটিরও বেশী মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকিতে বসবা করেছে।

২০১২ সালে কয়েকটি দেশের সম্মিলিত গবেষণার একটি প্রতিবেদন বের করা হয়। ঐ প্রতিবেদনে বলাহয় ২০১২ সালে আক্রান্তের সংখা ২২ লক্ষ যা ২০১৫ সালে বেড়ে ৩২ লক্ষ হয়। ঐ প্রতিবেদনে আরও বলা হয় প্রতিনিয়তই এর সংখা বাড়ছে। কিছু কিছু দেশে ডেঙ্গু মহামারী আঁকার ধারন করে। যা তাদের জীবন যাত্রার মান সহ দেশের জাতীয় অর্থনীতি তে ব্যাপক বাথা সৃষ্টি করে। ১৯৭০ সালের আগে বিশ্বের মাত্র ৯ টি দেশ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিল।

রোগের বহক

এই ভাইরাসের বাহক এডিস ইজিপ্টি মশা। ভাইরাস আক্রান্ত মহিলা এডিস মশা কামড়ের মদ্ধমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়। একবারের কামড়ালেই সংক্রমণ হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রান্ত বেক্তিও এই ভাইরাসের বাহক হিসেবে চিহ্নিত হয়। স্ত্রী মশা ডেঙ্গু আক্রান্তর রক্তপান করে নিজে সংক্রমিত হয় ও পেটে ভাইরাস বহন করে। প্রায় ৮-১০ দিন পর ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য কোষে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে আছে মশার লালাগ্রন্থি এবং শেষে এর লালায় চলে আসে। সারা জীবনের জন্য আক্রান্ত হলেও মশার উপর এই ভাইরাসের কোন ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে না । এডিস কৃত্রিম জলাধারে ডিম পাড়তে, মানুষের সবচেয়ে কাছে থাকতে এবং অন্যান্য মেরুদন্ড থেকে মানুষের রক্ত খেতে বেশি পছন্দ করে। সংক্রমিত রক্তসম্বন্ধী সামগ্রী এবং অঙ্গদান-এর মাধ্যমেও ডেঙ্গু পরিবাহিত হতে পারে।

রোগের বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ

ডেঙ্গু ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ভাইরাস-ঘটিত সর্দিজ্বর ঘটায় যা পরবর্তীতে মারাত্মক প্রাণঘাতী ডেঙ্গু জ্বরে পরিনত হয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রই শিশু ও ব্রিদ্ধ বয়স্কদের বেশী প্রভাবিত করে। এতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বিপদ বেশি। যাদের ডায়াবিটিস ও অ্যাজমা আছে তাদের ক্ষত্রে ডেঙ্গু অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরের মাত্রা থাকে ৪০ ডিগ্রী থেকে ১০৪ ডিগ্রী পর্যন্ত। সাথে মাথা ব্যথা, পেশী ব্যথা, চোখ ব্যথা, বমি বমি ভাব, শরীর ফুলে যাওয়া ও ফুসকুড়ি ওঠা ইত্যাদি।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণে রক্তে গ্লুকোজ, তরল সংক্রমণ, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ সহ গুরুতর রক্তস্রাব বা অঙ্গ ক্ষয় হতে পারে। ভাইরাস দেহ প্রবেশ করার ৪-৬ দিনের মধ্যে লক্ষন সমূহ দেখা দেয়। ৪০ থেকে ১০০ ডিগ্রী তাপমাত্রার সাথে তীব্র পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি, রক্ত বমি, দ্রুত শ্বাস ক্লান্তি ও অস্থিরতা দেখা দিবে।

চিকিৎসা

ডেঙ্গু রোগীর জন্য কোন নির্দিষ্ট চিকিত্সা নেই তবে যথাযথ মেডিকেল চিকিৎসার করেলে রোগে আক্রান্ত মৃত্যুর হার কম হয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলির উপর নির্ভর করে। এই রোগে মৃত্যুর হার ২০% – ১% এরও কম। শরীরে পানি শূন্যতা জাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরী। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে আক্রান্ত হলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

• পর্যাপ্ত পরিমান পানি পান করতে হবে
• ভিজা কাপোড় দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে
• জ্বরের সাধারন ওষুধ সেবন করতে হবে
• প্রয়জনে স্যালাইন দিতে হবে

প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ

বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ বা প্রতিরোধ করার প্রধান পদ্ধতি হচ্ছে ভাইরাস বহন কারী মশার মোকাবেলা করা। এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং কামড় থেকে বেচে থাকা। ডেঙ্গু মশা সাধারণত স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে জন্মায়।

  • সঠিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং সংশোধনের মাধ্যমে মশার ডিম-বিচরণস্থল ও বাসস্থান ধংস করতে হবে।
  • নিয়মিত ভাবে বর্জ্য অপসারণ এবং মানুষের তৈরি মশার উপযুক্ত আবাসস্থল অপসারণ করতে হবে।
  • নিয়মিত ভাবে গার্হস্থ্য পানি সঞ্চয়পাত্র খালি এবং পরিষ্কার রাখতে হবে। আশপাশের পানি সঞ্চয়পাত্রে উপযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ।
  • ঘর বা বাসার চারপাশে কোন স্থানে যেমন ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনা, ফুলের টব, ফুলদানি, ডাব বা নারিকেলের খোসা সহ যেকোনো কিছুতে যেন ৩-৪ দিনের বেশী পানি জমে না থাকে।
  • মশা কামড়ানোর সম্ভাবনা থাকলে দিনের বেলায়ও অবশ্যই মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হবে।
  • বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির ভিতর থাকবে।
  • ঘরে সবসময় মশা নিধনের স্প্রে বা এরোসল ব্যাবহার করতে হবে।
  • মশা নির্ধারণে সক্রিয় পর্যবেক্ষণ এবং নজরদারি করা উচিত।

উপসংহার

সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরে বড় কোন চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। ডেঙ্গু জ্বরে কোন নির্দিষ্ট ভ্যাক্সিন নেই। ডাক্তারি পরামর্শ ও প্রাথমিক চিকিৎসায় এই জ্বর ভাল হয়। সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝে ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি নির্মূল করা সম্ভব।

তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.