ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং স্মার্ট ক্যারিয়ার

দেশের বেকারত্ব দূরিকরনে অপার সম্ভবনাময় ক্ষেত্র হিসাবে বেশ ক বছর ধরেই ফ্রিল্যান্স-আউটসোর্সিং খাত এক বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। বর্তমানে দেশে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং এর সাথে জড়িত আছেন বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষতা সম্পন্ন কয়েক লক্ষ প্রফেশনালস। এদের মধ্যে অনেকের মাসিক আয় লাখ ছাড়িয়ে, বাকিদের অবস্থাও পরিবর্তন হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। টিম করে কাজ করে মাসিক পনেরো বিশ লাখের কোটায় আয় করছেন এমন অনেকের তথ্য ই বিভিন্ন অনুসন্ধান রিপোর্টে পাওয়া যায়, যা দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে কার্যকরি ভূমিকা পালন করছে।

ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং প্রফেশনে আইটি ব্যাকগ্র্যান্ড সহ নন আইটি প্রফেশানালসদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ইংরেজিতে দক্ষ ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগে পারদর্শীরা নির্দিষ্ট ট্রেডের প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে খুব সহজেই যুক্ত হচ্ছে এই ক্যারিয়ারে। শুধু আইটি’তে পড়াশুনা করেছেন তারাই তা নয়, নন আইটি ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেকেই বছর খানেক সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছেন সাফল্যের শীর্ষে। অনেকেই পড়াশুনার পাশাপাশি ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকতে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দক্ষতা উন্নয়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ফ্রিল্যান্স-আউটসোর্সিং?

এককথায় ফ্রিল্যান্সিং এর অর্থ হল মুক্তপেশা, নির্দিস্ট কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে না থেকে কোন স্বীকৃত ট্রেডে (যেমন গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়াকিং কিংবা ডিজিটাল মার্কেটিং) স্বাধীন ভাবে কাজ করা। অনেকে এটাকেই পেশা ভেবে থাকেন, আসলে এটা পেশার কাজ ও চুক্তির ধরণ ও অবস্থার নাম। আউটসোর্সিং-এ পেশা ত আপনার দক্ষতার নাম যেমন গ্রাফিক জানা কেউ গ্রাফিক ডিজাইনার বা নেটওয়ার্কিং-এ এক্সপার্ট নেটওয়ার্ক এডমিন, কিন্তু আপনি কাজটা করে দিচ্ছেন ফ্রিল্যান্স , অর্থাৎ ফিল্যান্সার হিসাবে। অনেকটা পত্রিকার ফিচার্ড রাইটার কিংবা ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফির মত কিন্তু এদের কারো পেশা সাংবাদিকতা বা কারো ফটোগ্রাফি, শুধু মাত্র এমপ্লয়ার এর সাথে কি চুক্তিতে কিভাবে কাজ করছে এটার অবস্থার নাম ফ্রিল্যান্সিং।
আয়ের সীমাবদ্ধতা নেই বললেই চলে , কাজ, দক্ষতা ও চুক্তির উপর নির্ভর করে কমে বাড়ে আয়ের পরিমাণ। অনলাইন ও ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের যেকোন প্রান্তে বসে করে দেওয়া যাচ্ছে কাজ। ফ্রিল্যান্সিং এর অপার সম্ভাবনা ছড়িয়ে পরেছে বিশ্বময়।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত ছোট বড় অনেক প্রতিষ্ঠান ই তাদের কাজ গুলো বিভিন্ন কারণে অফিসে এমপ্লইয়ি নিয়োগ না দিয়ে ভার্চুয়ালু প্রজেক্ট ও কাজ ভিত্তিক আলোচনা সাপেক্ষে কোন দক্ষ ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। যেমন ধরুন, আপনি নতুন ব্যবসা বা কোম্পানি করছেন তার জন্য অকর্ষনীয় লোগো, প্যাড, ব্যানার এসব ডিজাইন করতে হবে, কিন্তু আপনার প্রতিষ্ঠানে কোন গ্রাফিক ডিজাইনার নেই। এখন এসব ডিজাইনের কাজ করতে হলে অবশ্যই যেতে হবে ভালো কোন ডিজাইনার এর কাছে, এখন অনলাইনে ই যদি চান কাজটি করিয়ে নিতে! হ্যাঁ এই সুযোগ ব্যবস্থা ই আউটসোর্সিং।

আউসোর্সিং সম্পর্কে বিখ্যাত উক্তি –

“The strategic use of outside resources to perform activities traditionally handled by internal staff and resources”। – Dave Griffiths

প্রতিষ্ঠান গুলো নির্দিস্ট প্রজেক্টএ দক্ষতা বা দক্ষ লোকের অভাব, কিংবা নতুন নিয়োগ থেকে বাঁচতে কিংবা কষ্ট মিনিমাইজ করতে আউসোর্সিং করে থাকে। বাংলাদেশে প্রথিতযশা একজন তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, আওয়্যামাহ টেকনোলজিস এর প্রতিষ্ঠাতা আবু তাহের সুমন এক সেমিনারে কোম্পানি গুলোর আউটসোর্সিং করার প্রায় ৮টি গুরুত্বপূর্ন কারন তুলে ধরেন। এগুলো হচ্ছে দক্ষতার অভাব, ওয়ার্ক লোড কমানো, কষ্ট মিনিমাইজ, রেগুলার অফিস খরচ বাঁচানো, গুনগত মান বজায় রাখা, সময় বাঁচানো, অফিসিয়াল বিভিন্ন রিস্কম্যানেজমেন্ট এবং সর্বোপরি অপোরচুনিটি সেইভ করা। এভাবেই লাখ লাখ প্রজেক্ট কোটি কোটি টাকার মূল্যমানের নিয়মিত ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিং প্রসেসে নিত্যদিন সম্পন্ন হচ্ছে, গড়ে উঠছে বিশাল বাজার বিভিন্ন নির্দিস্ট মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে। মার্কেটপ্লেস এর বাইরে নিজস্ব ওয়েব সাইট, সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে ফ্রিল্যান্সারদের খুঁজে নিয়ে অনেক অনেক প্রজেক্ট সম্পন্ন হচ্ছে।

ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং-এ যেই গুরুত্বপুর্ন দক্ষতা গুলো সেইল করা যাচ্ছে এগুলোর মধ্যে অন্যতম বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ ডিজাইনিং, ডেস্কটপ, ওয়েব বা মোবাইল এপলিকেশন ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব মিডিয়া ও কপিরাইট বা সেলস কন্টেন্ট তৈরি, অনলাইন ডিজিটাল মার্কেটিং, সার্ভার ম্যানেজমেন্ট, ভার্চুয়াল এসিসটেন্সি ইত্যাদি।

ফ্রিল্যান্স কাজ করা বাদেও অনলাইনে এখন দক্ষতা সম্পন্ন প্রফেশনালসরা ক্যারিয়ার গড়ছে তথ্য উদ্যোক্তা হিসাবে। নিজেরাই নিজেদের ওয়েব সাইটে (নিস কিংবা আথোরিটি ওয়েব সাইটের মাধ্যমে) বিভিন্ন তথ্য সরাবরাহ করে ইউজারকে কাঙ্ক্ষিত তথ্য পৌঁছে দিয়ে গুগল অ্যাডসেন্স, অ্যামাজন এফিলিয়েশন এবং বিভিন্ন প্রডাক্ট বিক্রির মাধ্যমে মানিটাইজ করছেন, আয় করছেন। কেউ কেউ নিজেরাই নিজেদের ওয়েব সাইটের মাধ্যমে নিজেদের ডিজাইন সার্ভিস সেইল করছেন। এমন অনেকেই আছেন যারা টিম করে ডেস্কটপ ও ওয়েব বা মোবাইল ভিত্তিক এপলিকেশন ডেভেলপমেন্ট এর বিভিন্ন প্রডাক্ট বিক্রি বা সার্ভিস দিচ্ছেন। ভার্চুয়াল শিক্ষকতা বা কোর্সও করাচ্ছেন অনেকেই।

ইন্টারনেটের কল্যানে আরও আয়ের ক্ষেত্র নিত্য তৈরি হচ্ছে যা বাংলাদেশের মত দেশের জন্য আশির্বাদ বৈকি।

কিভাবে শুরু করবেন?

অনলাইনে এসব ক্যারিয়ারে যুক্ত হতে হলে প্রথমে কাজ জানা ও করতে পাড়ার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ এছাড়াও ইংরেজী জানা বাধ্যতামূলক ই বলা চলে, কেননা এই সেক্টরে ফ্রিল্যান্স হোক কিংবা তথ্য উদ্যোক্তা বা অন্য সার্ভিস সেইল সব ক্ষেত্রেই ইংরেজির ব্যাবহার অত্যাধিক। যে যত ইংরেজি ও কমিউনিকেশনে ভালো কাজ শিখা ও করা তার জন্য ততোটাই সহজ। আর শিখার আগ্রহ থাকতে হবে প্রচুর। কাজ শুরুর পূর্বে প্রশিক্ষণ নেয়ার বিকল্প নেই হোক সেটা অনলাইন কোর্স কিংবা ট্রেইনিং সেন্টার থেকে বাস্তব সম্মত প্রাশিক্ষন তবে গুগল করে বেসিকটা হয়তো শিখতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রে কিছু হিন্টস পাবেন কিন্তু পূর্নাংগ কিছু নয়, তাই অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় এতে সময় ক্ষেপণ ই হবে বেশি, তাই যোগ্যতা সম্পন্ন কারো তত্ত্বাবধানে কাজ শিখুন, এতে করে হাজার দিনের পথ কয়েক মাসে অতিক্রম করা সম্ভব। শিখার পর অবশ্যই কোন লোকাল কোম্পানি কিংবা কারো সাথে থেকে ইনন্টার্ন করে নিজের কাজ ও দক্ষতাকে ঝালাই করে নিন।
বলে রাখা ভাল অধর্য্যদের জন্য এ কাজ শিখা খুব কঠিন, কারন এখানে শিখার পিছনে প্রচুর সময় দিতে হবে। অধর্য্যরা এক্ষেত্রে সফলতা পায়না বললেই চলে।

সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে নিচের মডিউলগুলো মনে রাখুন-

ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং

মডিউল ১- প্রথমে আপনাকে জানতে হবে কি কি কাজ অনলাইন করার সুযোগ আছে এবং সেগুলো কি কি বিস্তারিত জানুন। প্রয়োজনে বাজার চাহিদা যাচাই করে দেখুন কোন কাজের ডিমান্ড কেমন।

মডিউল ২- এরপর জানতে চেষ্টা করুন কোন কাজ করতে কেমন যোগ্যতার প্রয়োজন, কিভাবে কোথায় কাজ করতে হয়, এবং শিখতে কেমন সময় লাগেতে পারে পাশাপাশি নিজেকে ওই অবস্থায় ভাবুন। যারা করছেন এমন কাউকে কাছে পেলে বিভিন্ন ভাবে জানার চেষ্টা করে অভিজ্ঞতা নিন।

মডিউল ৩- এবার ভেবে দেখুন কোন কাজটিতে আপনার ভালোলাগা কাজ করে, আপনি পেশনেট ফিল করেন কোনটাতে, এবং সহজেই প্রাশিক্ষক খুঁজে পাওয়া যাবে এবং আপনি শিখতে পারবেন, সিদ্ধান্ত নিন কোনটা শিখবেন।

মডিউল ৪- বিষয় নির্ধারনের পর অবশ্যই অলরেডি কাজ করছেন এমন কাউকে খুঁজে বের করুন, সভা সেমিনার গুলোতে যোগ দিন, সেখানকার স্পিকার ও গেস্ট প্রফেশনালসদের সাথে পার্সোনাল কানেকশনের চেষ্টা করুন তাঁর কাছ থেকে সময় নিয়ে বুঝে নিন কিভাবে কোথায় শিখা যাবে? কিভাবে শিখবেন অনলাইন প্রশিক্ষণ বিষয়ের উপর বিস্তারিত ধারণা নিন গুগোল এ পরাশুনা করে।

মডিউল ৫- কিছু কিছু কাজ আছে গুগলে সার্চ ও ইউটিউব ভিডিও দেখে সেখান থেকে বেসিক শিখা যায়। বেসিক জানা লোকের জন্য পরে ধাপে যাওয়া খুব সহজ, এক্ষেত্রে যারা কাজ করছে তাদের আলাপে প্রথম প্রশ্ন ই হবে বেসিক শিখে নিন আগে, তাই বেসিক ক্লিয়ার করতে হবে। এর পরের ধাপে যেতে গুগলে সার্চ করে করে শিখতে যাওয়া অনেক সময় সাপেক্ষ এবং অভিজ্ঞতা বলে বোকামীও। তাই এবার শিখাকে পরিপূর্ন করতে ভালো কোন মেন্টর বা ইনিস্টিটিউট খুঁজে বের করে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তবে অবশ্যই যে প্রতিষ্ঠানে শিখতে যাবেন পরিচিতদের কাছ থেকে তার রিভিউ নিয়ে যাচাই করবেন তারা কেমন প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, তাদের ওই কাজের জন্য আউট লাইন কেমন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞদের মতামত নিয়ে অনলাইন দেশি বিদেশি কোর্সেও জয়েন করতে পারেন।

আমাদের এই লেখাটি নতুনদের জন্য মূলত প্রস্তুত করা হয়েছে

আশা করি লেখাটি পরে আপনাদের অনেক বিষয়ে ধারণা স্বচ্ছ হওয়ার সাথে সাথে বিস্তারিত বুঝতে পেরেছেন। নতুন যারা ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং-এ ক্যারিয়ারে আসতে চান তারা মডিউলগুলো ফলো করে কাজ শিখা শুরু করলে সহজ হবে আশাকরি। একটা কথা মনে রাখবেন কোনো বিষয়ের উপর দক্ষতা অর্জন না করে সে কাজের জন্য নিজেকে ক্লায়েন্টের কাছে উপস্থাপন করবেন না, এতে করে নিজেদের ভাবমূর্তি ই নষ্ট হবে।

ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং নিয়ে বিডি আর্কাইভস এ এখন থেকে ধারাবাহিক পোস্ট আসবে নিয়মিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here