ভার্চুয়াল ভাইরাস | স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার দিন কে দিন আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে, যা ভার্চুয়াল ভাইরাস বৈকি। বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্মার্টফোন কিংবা এসব ভার্চুয়াল ভাইরাস মাদকাসক্তির চেয়েও অনেকাংশে মারাত্বক; যার মর্মান্তিক পরিণতি শুধু ব্যক্তি কেন্দ্রিক নয়, ধ্বংস করে দিতে পারে পরিবার, সমাজ এমনকি একটা জাতিকেও।

আসক্তি গুলোর মধ্যে অন্যতম সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, মেসেঞ্জার; ভিডিও প্লাটফর্ম ইউটিউব কিংবা ভার্চুয়াল বিভিন্ন অ্যাপ ভিত্তিক গেমস। কি শিশু, কিশোর বা যুবক কিংবা বৃদ্ধ আজ এই আগ্রাসনে সবাই একাকার, মগ্ন। মনণশীলতা হ্রাস ও স্বাথ্যঝুকির পাশাপাশি বাড়ছে নৈতিক অবক্ষয়; সবাইক হয়ে যাচ্ছে ভায়লেন্ট মাঝে অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারকে কেন্দ্র করে।

স্মার্টফোন আসক্তি না রোগ!

দেশের আনাচে-কানাচে নিতান্ত স্বল্প আয়ের মানুষের হাতেও পৌছে গেছে স্মার্টফোন। এটাকে আমরা কেউ কেউ হয়তো বলছি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, যা কিছু ক্ষেত্রে আশির্বাদ বৈকি কিন্তু অনেকাংশে চিন্তার কারনও বটে। এটা কারো প্রয়োজন আবার কারো কাছে স্ট্যাটাস সিম্বল। সমস্যা তখন ই-যখন কেউ মনে করে স্মার্টফোন ছাড়া তার জীবন অচল। ইদানীং বাংলাদেশের মত দেশের স্মার্টফোন ব্যবহারকারী যুবক যুবতির সংখ্যা ই বেশি। কিশোর কিশোরীরাও বাবা মায়ের অবহেলার কারণে স্মার্টফোনে যুক্ত।

যুক্তরাস্ট্রের ৪৬% মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার স্ট্যাটাস সিম্বল; এমনটাই মনে করেন। এ প্রেক্ষিতে গবেষকরা বলেছেন, একটু পর পর শুধু শুধু ফোন হাতে নেওয়া, অপ্রয়োজনে ঘটাঘাতি, কাজ ফেলে শয়তানের এই বাক্সের দিকে তাকিয়ে থাকা ইত্যাদি অভ্যাস কারো মধ্যে দেখা গেলেই বুঝতে হবে সে স্মার্টফোন আসক্তিতে আক্রান্ত। যখন-তখন যত্রতত্র সেলফি তোলার প্রবনতাকে এখন আর নিছক হাস্যকর আত্বপ্রেম বলে উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। কারণ সেলফিজনিত কারণে পৃথিবীর সর্বোউচ্চ মৃত্যুহারের দেশ ভারতে চারশ জনের ওপর গবেষণার ভিত্তিতে মনোবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যারা ঘন ঘন সেলফি তোলেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেলফি পোস্ট করার জন্য ব্যাকুল হয়ে পরেন তারা “সেলফিটিস” নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত। (ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ এন্ড এডিকশন ২০১৭)।

অত্যাধিক ফেসবুক ব্যবহার ব্যক্তিকে করছে নিঃস্ব হতাশ!

ফেসবুক আসক্তি আজ রুপ নিয়েছে এক বৈশ্বিক মহামারিতে। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফেসবুক ব্যবহারকারীর শহর ঢাকা! নীতিমালায় ১৮ বছরের ব্যক্তিই একাউন্ট খুলতে পারবে এই মর্মে নীতি থাকলে, এখন টু থ্রির বাচ্চাদেরও ফেসবুকে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যস্ত চ্যাট, চেকিন, স্ট্যাটাস আর লাইভ নিয়ে। যুক্তরাস্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান ২০১৩ এর মতে, ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে যত বেশি সময় কাটায় সে হয়ে পরে তত বেশী হতাশ, একাকী, পরিবার বিচ্ছিন্ন ও বিষন্ন। এমনকি মনসিক স্বাস্থ্যের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় ডিসেম্বর ২০১৭ তে বিবৃতি পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয় ফেসবুক কতৃপক্ষ। ফেসবুক পেজ আর না না গ্রুপের মাধ্যমেও অনেকে জড়িয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রতারনা আর অপরাধের সাথে!

ভার্চুয়াল গেম আসক্তি-সামাজিক সমস্যা

২০১৮ সালে প্রণীত ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিস-এ ভিডিও/ অনলাইন গেম আসক্তিকে প্রথমবারের মত একটি মানসিক রোগ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইতমধ্যেই চীন, জাপান, ও দক্ষিন কোরিয়ায় ভিডিও গেম আসক্তিকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আসুন এবার জেনে নেই রিসার্চে প্রমাণিত আসক্তির ব্ল্যাকহোলগুলো সম্পর্কে

• অনলাইন গেইম আসক্ত ব্যক্তি বাস্তবতা ও কল্পনার মাঝে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। (সি এন এন ৫ মার্চ ২০১০)

• যুক্তরাজ্যের হার্লি স্ট্রিট রিহ্যাব ক্লিনিকের একটি গবেষনায় বলা হয়, শিশুর হাতে স্মার্টফোন/ট্যাব তুলে দেয়া আর কোকেন বা মদের বোতল তুলে দেয়া একই কথা। (দ্যা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ৭ জুন ২০১৭)

• স্মার্টফোন আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের কাঠামোতে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে (রেডিওলজিক্যাল সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকা ৩০ নভেম্বর ২০১৭)

• ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্স বিভাগের পরিচালক ড. পিটার হোয়াইব্রোর মতে স্মার্টফোন/ট্যাব স্ক্রিন হলো ইলেকট্রনিক কোকেন। চীনা গবেষকরা একে বলেছেন ডিজিটাল হেরোইন। আর পেন্টাগন ও ইউ এস নভির অ্যাাডিকশন রিসার্চ বিভাগ ভিডিও গেম ও স্ক্রিন টেকনলজিকে অভিহিত করেছেন ডিজিটেল মাদক হিসেবে। (নিউইয়র্ক পোস্ট ২৭ আগস্ট ২০১৬)

• যুক্ত্রাস্ট্রে প্রতি চারটি সড়ক দূর্ঘটনার একটি ঘটে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে মেসেজ আদান-প্রদানের কারণে। (দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস ২৫ জানুয়ারি ২০১৮)

প্রযুক্তিবিদদের কিছু সতর্কতা

• শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি পন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের কর্ণধার স্টিভ জবস একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার সন্তানরা কখনো আইপ্যাড ব্যবহার করে নি। কতটুকু প্রযুক্তি তারা ব্যবহার করবে তা আমি ঠিক করে দিয়েছি। (নিউইয়র্ক টাইমস ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

• মাইক্রোসফট এর প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তার সন্তানদের বয়স ১৪ হওয়ার আগে মোবাইল ফোন কিনে দেন নি। এমনকি তিনি নিয়ম করে দিয়েছিলেন দিনে ৪৫ মিনিটের বেশী কম্পিউটার ব্যবহার করা যাবে না এবং খাবার টেবিলে মোবাইল ফোন আনা নিষেধ (দ্যা ইনডিপেন্ডেন্ট ২১ এপ্রিল ২০১৭)

• ফেসবুকের সাবেক প্রেসিডেন্ট শন পার্কার অনুতপ্ত হয়ে স্বীকার করেছেন যে, শুধু ঈশ্বর ই বলতে পারেন-আমরা পৃথিবীর শিশুদের মুস্তিষ্কের না জানি কী ক্ষতি সর্বনাশ করে বসে আছি। (দ্যা গার্ডিয়ান ১২ ডিসেম্বর ২০১৭)

প্রযুক্তি অভ্যস্ততা স্বাস্থ্যহীনতা ও চিন্তাশক্তি লোপের কারণ

ঘারব্যথা ও ব্যাকপেইনের রোগীর সংখ্যা বিশ্বব্যাপি ক্রমশ বাড়ছে। এর কারণ হিসেবে স্পাইন সার্জনরা চিহ্নিত করেছেন স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারকে। দক্ষিন কোরিয়ার উলসফন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনলজির গবেষকরা জানাচ্ছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারের সঠিক দেহভঙ্গি বাতলে দেয়াও কঠিন-মাথা নিচু করে দীরঘক্ষন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘাড়-পিঠে ব্যাথা হবে। আবার মাথা সোজা রেখে বার বার স্মার্টফোন তুলে ব্যবহার করলে তাও কাধ ও কনুই এর জন্য ক্ষতিকর। (রয়টার্স ১৪ এপ্রিল ২০১৭)। ইউনিভাসিটি অব কেলিফোর্নিয়া লস এজ্ঞেলস-এর সাইকোলজিস্ট প্রফসর ড্যানিয়েল ওপেনহেইমার বলেন ক্লাস নোট হাতে লিখলে তা একজন শিক্ষার্থীর বেশী সময় মনে থাকে। কিন্তু লেপটপে নোট নিলে তা মনে থাকে খুবই স্বল্প সময়। গবেষকরা দেখেছেন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও চিন্তাশক্তি কমিয়ে দেয় স্মার্টফোন। যে শিশুরা অতিরিক্ত সময় স্মার্টফোন, ট্যাব ও কম্পিউটারের স্ক্রিনে সেঁটে থাকে তারা কোন কিছুতেই দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। (দ্যা গার্ডিয়ান ২৬ জানুয়ারি ২০১৮)।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আগামী প্রজন্ম

• ভার্চুয়াল ভাইরাসের সবচেয়ে বর শিকার শিশুরা। বর্তমান বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু (ইউনিসেফ রিপোর্ট জানুয়ারি ২০১৬)

• মার্কিন শিশু-কিশোরদের অটিজম, মনোযোগ হ্রাস, হতাশা ও তিব্র বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সাথে ভিডিও গেম আসক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে (দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট ৭ ডিসেম্বর ২০১৬)

• পাবলিক হেলথ ইংলেন্ড-এর গবেষণা অনুযায়ী, যেসব শিউ কম্পিউটার, টলিভিশন ও ভিডিও গেম নিয়ে দিনের বেশীরভাগ সময় ব্যস্ত থাকে তারা হয়ে পরে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ও হীনমন্যতার শিকার। এছাড়া আমেরিকান কলেজ অব পেডিয়াট্রিশিয়ানস-এর ভাষ্যমতে শিশুদের অনিদ্রা, মেদ স্থুলতা, আগ্রাসী মনোভাব ও আত্ববিশ্বাসহীনতার অন্যতম কারণ স্ক্রীন আসক্তি। (দ্যা গার্ডিয়ান ২৬ জানুয়ারি ২০১৮)

সচেতন হোন এখন ই

• টিভি, ট্যাব, স্মার্টফোন চালিয়ে আপনার সন্তানকে খাবার খেতে অভ্যস্ত করবেন না।
• সন্তানকে বই পড়া, ব্যায়াম, খেলাধুলাতে উৎসাহিত করুণ ও পরিবারের প্রাত্যহিক কাজে সম্পৃক্ত করে নিন।
• ১৮ বছর বয়সের আগে সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দিবেন না।
• রাত ১১টার পর ভার্চুয়াল জগত থেকে দূরে থাকুন।

তাই আসুন সময় থাকতে সচেতন হই। ভার্চুয়াল ভাইরাসের মরণ-আগ্রাসন থেকে নিজে বাচি, বাচাই সন্তানদের। সচেস্ট হই আত্বীয়-বন্ধু-প্রতিবেশীদেরও বাঁচাতে। বাচাই প্রিয় দেশবাসীকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here