
শরীরে রক্তচাপ প্রয়োজনের তুলনায় কমে গেলে তাকে লো প্রেসার বা হাইপোটেনশন বলা হয়। এটি সাময়িক হলেও অনেক সময় বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। আমরা এখানে লো প্রেসারের সব কারণ, লক্ষণ, ঝুঁকি, প্রতিকার ও প্রতিরোধ পদ্ধতি নিয়ে একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছি, যাতে আপনি সহজেই স্বাস্থ্য সচেতন হতে পারেন।
লো প্রেসার কী?
রক্তচাপের স্বাভাবিক মাত্রা হলো প্রায় 120/80 mmHg। যখন সিস্টোলিক চাপ 90 mmHg-এর নিচে এবং ডায়াস্টোলিক চাপ 60 mmHg-এর নিচে নেমে যায়, তখন তাকে লো ব্লাড প্রেসার বলা হয়। এই অবস্থায় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত না পেলে মাথা ঝিমঝিম করা, দুর্বল লাগা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
লো প্রেসারের প্রধান কারণ
লো প্রেসার হওয়ার পেছনে বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক ও হরমোনজনিত কারণ থাকতে পারে। নিচে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
১. পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন
শরীরের পানি কমে গেলে রক্তের পরিমাণও কমে যায়। এতে রক্তচাপ দ্রুত নিচে নেমে যায়। অতিরিক্ত ঘাম, ডায়রিয়া, বমি বা গরম আবহাওয়ার কারণে এটি বেশি ঘটে।
২. পুষ্টিহীনতা এবং ভিটামিন কমতি
ভিটামিন B12, ফোলেট ও আয়রনের ঘাটতি রক্তকণিকার সংখ্যা কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তচাপ হ্রাস পায়।
৩. অর্থপেডিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension)
দীর্ঘ সময় বসা বা শোয়া অবস্থায় থাকার পর দ্রুত দাঁড়ালে মাথা ঘোরা বা চোখে অন্ধকার দেখা দিতে পারে। এটি লো প্রেসারের একটি সাধারণ ধরন।
৪. গর্ভাবস্থা
গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়লেও রক্তনালীগুলো প্রসারিত থাকে, ফলে অনেক মায়েরা লো প্রেসার অনুভব করেন।
৫. রক্তক্ষরণ বা ইনজুরি
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে যায়, যার ফলে রক্তচাপ হঠাৎ নিচে নেমে যায়।
৬. হৃদরোগ বা হার্টের দুর্বলতা
হার্ট ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে না পারলে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত কম পৌঁছায় এবং হাইপোটেনশন সৃষ্টি হতে পারে।
৭. হরমোনগত সমস্যা
থাইরয়েডের সমস্যা, অ্যাড্রেনাল গ্ল্যান্ডের দুর্বলতা (Addison’s Disease) বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা রক্তচাপ কমাতে পারে।
৮. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অনেকসময় কিছু ওষুধ যেমন—
- ডাইইউরেটিকস
- এন্টিডিপ্রেসেন্ট
- হাই ব্লাড প্রেসার কমানোর ওষুধ
- ব্যথানাশক
লো প্রেসার তৈরি করতে পারে।
লো প্রেসারের সাধারণ উপসর্গ
রক্তচাপ কমে গেলে শরীরে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়—
- মাথা ঘোরা
- চোখে ঝাপসা দেখা
- দুর্বলতা বা ক্লান্তি
- অসুস্থ লাগা
- বমি বমি ভাব
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (সিঙ্কোপ)
- মাথাব্যথা
- ঠান্ডা লাগা ও ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
যদি এসব লক্ষণ বারবার দেখা দেয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লো প্রেসার হলে তাৎক্ষণিক করণীয়
লো প্রেসার হঠাৎ হলে নিচের পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে দ্রুত কাজ করে—
১. পানি বা ওরস্যালাইন পান করুন
ডিহাইড্রেশনজনিত লো প্রেসারের ক্ষেত্রে পানি বা ওরস্যালাইন দ্রুত কাজে দেয়।
২. লবণযুক্ত খাবার খান
স্বল্পমাত্রায় লবণ রক্তচাপ বাড়াতে সাহায্য করে। তবে উচ্চরক্তচাপ থাকলে সতর্ক থাকতে হবে।
৩. শুয়ে পড়ুন বা বসে পা উঁচু করুন
পা উঁচু করলে রক্ত দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং মাথা ঘোরা কমে।
৪. হালকা গরম পানি পান করুন
গরম পানি রক্তচলাচল বাড়ায় ও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়াতে সাহায্য করে।
৫. চা বা কফি পান করুন
ক্যাফেইন রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়াতে সহায়ক।
লো প্রেসারের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা
যদি লো প্রেসার ঘনঘন হয়, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে—
১. ফ্লুড্রোকর্টিসোন বা মিডোড্রিন
রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য বিশেষ কিছু ওষুধ দেওয়া হতে পারে (শুধু চিকিৎসকের পরামর্শে)।
২. সঠিক ডায়েট প্ল্যান
সুষম খাদ্য, ভিটামিন, আয়রন, পানি, লবণযুক্ত খাবার—এসব নিয়মিত গ্রহণ করলে লো প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৩. জীবনযাত্রার পরিবর্তন
- নিয়মিত ব্যায়াম
- পর্যাপ্ত ঘুম
- স্ট্রেস কমানো
- হঠাৎ দাঁড়ানো বা বসা থেকে বিরত থাকা
লো প্রেসার প্রতিরোধের কার্যকর উপায়
লক্ষণের আগেই প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। নিচে প্রতিদিনের জীবনযাপনে সহজ কিছু অভ্যাস দেওয়া হলো—
১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের দৈনিক ২.৫–৩ লিটার পানি পান করা উচিত।
২. নিয়মিত খাবার খান
অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। তাই দিনে ৩-৫ বার অল্প অল্প করে খাওয়া উচিত।
৩. লবণের সঠিক মাত্রা বজায় রাখুন
লো প্রেসার থাকলে খাদ্যতালিকায় একটু বাড়তি লবণ যোগ করা যায় (ডাক্তার পরামর্শে)।
৪. কম্প্রেশন স্টকিং ব্যবহার
এটি পায়ের রক্তনালীগুলোকে সাপোর্ট দেয় এবং রক্তচাপ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
৫. ব্যায়াম করুন
হালকা হাঁটা, যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর।
লো প্রেসার কখন বিপজ্জনক?
লো প্রেসার সবসময় ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন—
- বুকে ব্যথা
- শ্বাসকষ্ট
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- বিভ্রান্তি বা মানসিক অসংলগ্নতা
- দ্রুত হৃদস্পন্দন
- উচ্চ জ্বরের সঙ্গে লো প্রেসার
এসব লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক।
বিশেষ সতর্কতা
- গর্ভবতী নারী
- বয়স্ক মানুষ
- দীর্ঘস্থায়ী রোগী
তাদের ক্ষেত্রে লো প্রেসার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্ত কথা
স্বাস্থ্য একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ, তাই লো প্রেসারকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সময়মতো চিকিৎসা লো প্রেসার প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। নিজের শরীরের লক্ষণগুলো খেয়াল রাখুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আরো পড়ুনঃ
কোমর ব্যথা কমানোর কার্যকর উপায়
শরীরের জয়েন্টে ব্যথা বা আর্থ্রাইটিস: কারণ, লক্ষণ ও ব্যথা কমানোর উপায়?
পিঠের ব্যথার কারণ ও ব্যথা দূর করার কার্যকর উপায়