
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন — বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ বেগম খালেদা জিয়া আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সালের সকাল ৬টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, বয়স হয়েছিল প্রায় ৮০ বছর।
শৈশব, শিক্ষা ও পারিবারিক জীবন
খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ছোট থেকেই তিনি সাধারণ পরিবারিক পরিবেশে বড় হন। পরবর্তী সময়ে তিনি জীবনযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পেতে যখন তিনি সামরিক অফিসার ও পরে রাষ্ট্রপতি হওয়া জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
তার জীবন তখন থেকে রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে থাকে। ১৯৮১ সালের জিয়াউর রহমানের হত্যার পর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং বিএনপি’র নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক উত্থান ও শক্ত অবস্থান
১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (BNP) চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। এর পর থেকে তিনি দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং সেই সময়ের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে প্রধান নেতৃত্ব দেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচন তাদের কঠোর সংগ্রামের সফলতা এনে দেয় এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন — এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিশাল সামাজিক ও রাজনৈতিক সাফল্য।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সময় ও নীতি
খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনবার দায়িত্ব পালন করেছেন (১৯৯১-১৯৯৬; সংক্ষিপ্ত ১৯৯৬; ২০০১-২০০৬)। তার নেতৃত্বে সরকারের নীতি গুলোতে বেশ কিছু সামাজিক উদ্যোগ চালু হয়েছিল, বিশেষ করে:
- শিক্ষা খাতে উন্নয়ন: প্রাথমিক শিক্ষা বিনামূল্যে করার উদ্যোগ ও মেয়েদের শিক্ষায় নানা সুযোগ সৃষ্টি।
- সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান: বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা সংশোধনের মতো নীতি নেওয়া হয়েছিল।
তবে তাঁর সরকারসমূহ সবসময় সমালোচনা থেকে মুক্ত ছিল না। নেতৃত্বকালে নীতিগত সংঘাত, বিরোধী দলের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং সময় সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে সমালোচনাও এসেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধিতা
খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায়। তাঁদের মধ্যে বিরোধ বহু বছর ধরে চলে এসেছে। এই দুই নেত্রীর পালা-পালিতে ক্ষমতায় আসা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দেশের রাজনীতি, আন্দোলন ও কখনও কখনও সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
আইনি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লড়াই
২০০৭-০৮ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর, খালেদা জিয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল। তিনি এই মামলাসমূহের কারণে জেলও খেটেছেন এবং সাময়িকভাবে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় পড়েছিলেন, যদিও বহু সমর্থক এই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে দেখেছেন।
তারপর দীর্ঘদিন তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে নানা সমস্যায় দিকপাল্টা সময় কাটিয়েছেন — যেটি গভীর অসুস্থতা, সিরোসিস, ডায়াবেটিসসহ একাধিক জটিলতায় পরিণত হয়েছিল।
শেষ সময় ও মৃত্যু
২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপ হওয়ায় চিকিৎসকরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং পরর্বতীতে ভেন্টিলেটর সাপোর্টের প্রয়োজন হয়।
পরম করুণ, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সালের ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, এবং দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ও শোকের ছায়া নেমে আসে।
ঐতিহাসিক সরকারনেত্রী
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন:
✔️ দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী,
✔️ দীর্ঘকাল ধরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তির নেত্রী,
✔️ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিরলস সংগ্রামী।
সাথে সাথে, তাঁর জীবনে ছিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও বিতর্কও — যা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিকে বদলে দিয়েছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখেছেন।