ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং এ বাংলাদেশের সম্ভাবনা

যখন কোন দেশের কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি থাকে তখন একটি দেশ ডেমোগ্রাফিক বোনাসে প্রবেশ করে। ২০১২ সালে আমাদের বাংলাদেশ এ ডেমোগ্রাফিক বোনাস এ প্রবেশ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ২০১২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়ন বা ১৬ কোটি সেই হিসেবে প্রায় ৭ কোটি জনগণ ১৮ বছ এর নিচে। (তথ্যসুত্রঃ সিআইএ- দ্যা ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক)। উন্নত এবং উন্নয়নশীল খুব কম দেশই এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পেয়েছে।

চীনে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী থাকলেও ২০১২ সালে দেশটি ডেমোগ্রাফিক বোনাস থেকে বের হয়ে গেছে, অর্থ্যাৎ দেশটিতে এখন নির্ভরশীল জনগনের সংখ্যা বেশি। সেখানে আমাদের বর্তমানে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা বেশি, নির্ভরশীল নয়। এটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় ইতিবাচক দিক। কিন্তু সেই ইতিবাচক দিকটির উপযুক্ত ব্যবহার কি আমরা করতে পারছি? না পারছি না। আমাদের দেশে এখন লাখো বেকার চাকুরির আশায় ঘুরছে, কর্মের সুযোগ খুঁজে ফিরছে। এই বিপুল জনসাধারণকে কাজ দিতে না পারলে এই কর্মক্ষম লোকগুলো আমাদের জন্য সম্ভাবনা না হয়ে বরং বোঝা হবে। শুধু বিদেশে লোক পাঠিয়ে বা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে এত কাজ দেয়া সম্ভব না। বাংলাদেশের এই শিক্ষিত বিপুল কর্মক্ষম জনগনের কাজের জন্য অনলাইন আউটসোর্সিং শিল্পের অনলাইন ফ্রিল্যান্স পেশাদার হিসাবে গড়ে তোলা অন্যতম ফলপ্রসু সমাধান হতে পারে।

অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিং

ইদানিং বাংলাদেশে খুব বেশি মাতামাতি হচ্ছে আউটসোর্সিং নিয়ে। রাতারাতি বড়লোক হবার বাহারি ও রকমারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করার পায়তারায় মত্ত আছে একটি শ্রেণী। অনলাইনে আয় করার এইসব বাহারি বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে প্রতারিতও হচ্ছে অনেকে।

ফ্রিলেন্সিং ও আউটসোর্সিং এর মধ্যে পার্থক্য

অনেকে আউটসোর্সিং ও অনলাইনে আয় বিষয় দুটোকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। যখন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁর নিজের বা প্রতিষ্ঠানের কাজ ইন-হাউজ না করে বাইরে কাউকে দিয়ে করিয়ে নেয় তখন সেটি হচ্ছে আউটসোর্সিং। আর ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে যখন কোন ব্যক্তি কোন নির্দিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন তখন তাঁকে ফ্রিল্যান্সার বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে আউটসোর্সিং নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে সেটা মূলত ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের আউটসোর্সিং। ব্যবসায়িকভাবে আউটসোর্সিং সার্ভিসের শিল্পটা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এটা ঠিক আউটসোর্সিং সার্ভিস দেয় এমন অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে এবং দিন দিন এটি বাড়ছে। অনেকের মধ্যে ফ্রিল্যান্সার হিসাবে কাজ শুরু করে উদ্যোক্তা হবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এটি সত্যিই আশা ব্যঞ্জক।

কেন আউটসোর্সিং করা হয়?

তৃতীয় বিশ্বে আউটসোর্সিং করে উন্নত দেশের ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক কমিয়ে নিচ্ছেন। কতটা কমছে তার একটা ধারনা দেই, আমেরিকায় একজন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) পেশাজীবির গড় বেতন ৫০ হাজার ডলার। কিন্তু বাংলাদেশী কোন সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজারকে এই কাজটি দেড় থেকে ২ হাজার ডলার দিয়ে করিয়ে নেয়া সম্ভব। এখন হিসাব করুন কি পরিমাণ খরচ কমে যাচ্ছে আউটসোর্সিংয়ের ফলে।

আমরা কিভাবে লাভবান হব?

আমাদের যদি কাজের ক্ষেত্রে দক্ষতা থাকে তবে উন্নত দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজগুলো আমরা বাংলাদেশে বসেই করে দিতে পারি। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার হিসাবে আমরা যদি মাসে ২ হাজার ডলারও আয় করতে পারি, বাংলাদেশী টাকায় সেটি দাড়াবে ২ লাখ টাকার উপরে। বাংলাদেশি কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে কি এই পরিমাণ অর্থ কোনভাবেই আয় করা সম্ভব?

কারা যুক্ত হতে পারে এ কাজে?

যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব কাজ আউটসোর্সিং হয় বা সামনের দিনগুলোতে হবে তার একটা – তথ্যবিবরণী নিচে দেয়া হলো। এই সকল কাজগুলো করার জন্য যে ধরনের যোগ্যতা লাগে তার একটা ধারনা পাওয়া যাবে নিচের তালিকা থেকে।

ক্রমিককাজের ধরন২০০০ সাল২০০৫২০১০২০১৫
ব্যবস্থাপনা৩৭৪৭৭১১৭৮৩৫৮৮২৮১
ব্যবসা১০৭৮৭৬১২৫২১৬১৭২২৪৮০২৮
কম্পিউটার২৭১৭১১০৮৯৯১২৭৬৯৫৪৭২৬৩২
আর্কিটেকচার৩৪৯৮৩২৩০২৮৩২৩৭৮৪৩৪৭
জীববিদ্যা৩৬৭৭১৪৪৭৮৩৬৭৭০
আইন বিষয়ক১৭৯৩১৪২২০৩৪৬৭৩৭৪৬৪২
আর্ট ও ডিজাইন৮১৮৫৫৭৬১৩৮৪৬২৯৬৩৯
সেলস৪৬১৯২৯০৬৪৯৭৩২১২৬৫৬৪
অফিস৫৩৯৮৭২৯৫০৩৪৭৯১০৩৪১৬৫৯৩১০
মোট১০২৬৭৪৫৮৭৫৯২১৫৯১১০১৩৩২০২১৩
যুক্তরাস্ট্রের শ্রমমন্ত্রনালয়ের তথ্য থেকে নেয়া

উপরের তথ্য বিবরণীটি দেখলেই বুঝে যাওয়ার কথা বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়গুলো পড়ছে। বিবিএ পড়ুয়া একজন ছাত্র অনায়েশে মানব সম্পদ উন্নয়ন, অর্থ-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কাজ, হিসাবরক্ষণ, বাজার গবেষণা বিষয়ক কাজগুলো করতে পারে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরবর্তী প্রজন্মের স্থপতি, ইঞ্জিনিয়ার ও ডাক্তার তৈরি হচ্ছে। তাঁরাও চাইলে আউটসোর্সিং শিল্পের একজন মুক্ত পেশাজীবি হতে পারেন। কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো আমাদের স্কুল বা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাও করতে পারে, যেমন ডাটা এন্ট্রির কাজ।

কেন ফ্রিল্যান্সিং সবচেয়ে ফলপ্রসু সমাধান?

লেখার শুরুতে বলেছিলাম বাংলাদেশের এই বিপুল কর্মক্ষম জনগনের কাজের জন্য ফ্রিল্যান্সিং অন্যতম ফলপ্রসু সমাধান। অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং যতটা না কায়িক পরিশ্রমের কাজ তার চেয়ে বেশি – বুদ্ধিদীপ্ত কাজ। আর আমাদের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদেরকে যদি অনলাইন ফ্রিল্যান্স কাজগুলো একবার ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়া যায় তবে তাঁরা অনায়াসেই এ ক্ষেত্রে অনেক ভালো কিছু করতে পারবে।

আমদানী নির্ভর আমাদের এ দেশে যত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রয়োজন হয় তার একটি বড় অংশ আসে আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে। ২০১২ সালে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের শ্রমিকেরা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন (তথ্যসূত্রঃ ওয়াল্ড ব্যংক)। প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে এটা ধরে নিলে ২০১৫ সাল নাগাদ সেটা হবে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ইউএস ডলারের কাছাকাছি।

এবার আসা যাক আউটসোর্সিং শিল্পের দিকে। সামনের দিনগুলোতে প্রচুর পরিমান কাজ আউটসোর্স হবে। আমরা যদি এর ১০% ও মার্কেট শেয়ার নিতে পারি তাহলে সেটা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বর্তমানের সবচেয়ে বড় খাতকেও অতিক্রম করবে।

আমাদের দেশে প্রায় ৫০ শতাংশই মহিলা। আর এ মহিলাদের একটা বিশাল অংশ অর্থনীতিতে হিসাব হয় এমন কাজ খুব কমই করেন। তাঁরা বাসায় বসে যে কাজ করেন সেটা জিডিপিতে হিসাব হয় না। কিন্তু তাদের একটা বড় অংশ চাইলে বাসায় বসে প্রতিদিন ৩-৪ ঘন্টা সময় দিলে প্রতি ঘন্টা ১ ডলার হিসাবে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩-৪ ডলার ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করতে পারেন। মোট কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা যদি ৭ কোটি হয় তাহলে নারী আছে ৩.৫ কোটি। এর মধ্যে শিক্ষিত তরুণী এবং মহিলা যদি অর্ধ কোটিও হয় এবং তাঁদেরকে ফ্রিল্যান্সার হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয় তবে প্রতিদিন ১.৫ কোটি ডলার আয় আসবে এ ক্ষেত্র থেকে। বছরে এ আয়ের পরিমাণ দাড়াবে ৫০০ কোটি ডলারে।

আমরা কি প্রস্তুত?

একদিকে আমাদের যেখানে কর্মক্ষম লোকের অভাব নেই অপরদিকে বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিং শিল্পের কাজও অফুরন্ত। এত সম্ভাবনার মাঝে আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত? সত্যি কথা বলতে আমাদের প্রস্তুতি তেমন নেই বললেই চলে। নতুন ধারায় তরুণদের হাত ধরে উন্নতি যা হচ্ছে তাও নষ্ট হচ্ছে রাতারাতি বড়লোক হবার বাহারি ও রকমারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করান পায়তারায়। অনলাইনে আয় করার এইসব বাহারি বিজ্ঞাপনের বক্তব্য দেখলে মনে হয় যে অনলাইনে আয় করতে কিছুই জানতে হয় না, শুধু ইন্টারনেট ও কম্পিউটার থাকলেই হয়। কোন ধরনের সাহায্য ছাড়া আমাদের তরুণেরা যে শিল্পটা কেবল তৈরি করছে সেটা ধ্বংস করে দিয়ে এই সকল ফটকা ব্যবসায়ীরা। অবস্থা এমন যে অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে ফ্রিল্যান্সার বা আউটসোর্সিং শিল্পের সাথে জড়িত এটা বলতে বিব্রত হতে হয়। এ ক্ষেত্রে এখন আমাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে ভালোমানের যে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো আছে তাঁদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করা জরুরী। আর এক্ষেত্রে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান যেন মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিয়ে এগিয়ে আসে সে বিষয়টির আমাদের মাথায় রাখা দরকার। ভালো মানের প্রশিক্ষণ ছাড়া ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করা সম্ভব নয়।

আরো পরুনঃ ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং স্মার্ট ক্যারিয়ার | আল্টিমেট গাইডলাইন পার্ট ১
অনলাইনে আয়ের সেরা ১০ উপায় | ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং আল্টিমেট গাইডলাইন পার্ট ২
গ্রাফিক্স ডিজাইন কি | কিভাবে শিখবেন | ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং আল্টিমেট গাইডলাইন পার্ট ৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *